• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২১, ৯ মাঘ ১৪২৭
Bangla Bazaar
Bongosoft Ltd.

সম্মুখযুদ্ধে অগ্রবর্তী নারী


বাংলাবাজার ডেস্ক | বাংলাবাজার প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩১, ২০২০, ১২:০০ পিএম সম্মুখযুদ্ধে অগ্রবর্তী নারী
করোনাকালে ঝুঁকি নিয়ে নারী চিকিৎসক,নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন ছবি: সংগৃহীত

‘আমি মহাবিদ্রোহী রণক্লান্ত!/ আমি পরিশ্রান্ত কিন্তু এখন বিশ্রামের সময় নাই/ যেদিন মহামারি থামবে আমি সেই দিন হব শান্ত...।’

করোনাকালে নিজের কাজের অভিজ্ঞতা নারীমঞ্চের পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করতে বলায় বিদ্রোহী কবির কাব্যের আদলে নিজেই এমন নানা কথা লিখে পাঠালেন যিনি, তাঁর নাম আমেনা সুলতানা। পেশায় চিকিৎসক। রাজধানীর একটি বিশেষায়িত হাসপাতালের কোভিড আইসিইউয়ের ইনচার্জ এবং আইসিইউ ও জরুরি বিভাগের অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট তিনি। বাংলাদেশের ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন (সংকটাপন্ন রোগীর জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিশেষায়িত শাখা) বিভাগের প্রথম নারী শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। সংস্কারাচ্ছন্ন মানসিকতার বিরুদ্ধে লড়ে চলেছেন প্রথম থেকেই। ‘মেয়ে মানুষ’ কি ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) প্রধান হয়ে কাজ করতে পারবেন!

সেই নারীরাই কিন্তু আজকের দিনে এ দেশের হাসপাতালগুলোর প্রধান চালিকা শক্তি। চিকিৎসক, সেবিকা, রোগীর নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজের সহযোগী—সব ভূমিকাতেই নারী অনন্য। ব্যতিক্রম নয় মহামারির এই ক্রান্তিলগ্নেও। দেশজুড়েই নারীরা সেবা দিয়ে চলেছেন কোভিড-১৯–এ আক্রান্ত রোগীদের। আমেনা সুলতানার ভাষায়, ‘এই যুদ্ধ অসম যুদ্ধ। যতটা শারীরিক, ঠিক ততটাই মানসিক, পারিবারিক, সামাজিক, আর্থিক, বৈশ্বিক রাজনীতির। ইতিহাস সাক্ষী, যুদ্ধে নারীরা আক্রান্ত হয় সংবেদনশীলভাবে। ভাইরাসের এই যুদ্ধেও তা-ই। নারী আমি, সম্মুখযোদ্ধাও আমি।’

এপ্রিল থেকে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবায় যোগ দিয়েছেন তিনি। একই মাসে যোগ দিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. নুসরাত সুলতানা এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউয়ের সিনিয়র স্টাফ নার্স সাদিয়া জান্নাত। প্রত্যেকেই পেয়েছেন পারিবারিক ও সামাজিক সমর্থন। তবু সবার গল্প এক নয়।

মহামারির মহাদুঃসময়ে

কারও বাড়িতে বয়স্ক মা-বাবা কিংবা তাঁদের তুল্য অন্য গুরুজন, কারও রয়েছে ছোট্ট শিশু। অ্যাজমা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগে ভোগা সদস্য রয়েছেন কারও বাড়িতে, যাঁদের করোনাভাইরাসজনিত জটিলতার ঝুঁকি বেশি। কেউ নিজেই রয়েছেন ঝুঁকি তালিকায়। কেউ হয়তো সন্তানসম্ভবা। নারী হিসেবে সংসারের সব দিক সামলানোর গুরুদায়িত্ব তো রয়েছেই, এ যুদ্ধের বড় আতঙ্ক নিজের মাধ্যমে আপনজনদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আতঙ্ক। আমেনা সুলতানার ভাষায়, ‘নিজের নিশ্বাসও ক্ষতিকর সন্তানের জন্য।’ ‘রেড জোন’ বা সর্বাধিক বিপজ্জনক জায়গাতেই যে কাটে দিনের বড় একটা সময়। কেউ হয়তো মাসের যে দিনগুলোয় করোনা রোগীদের সেবার দায়িত্বে ছিলেন, সেই দিনগুলো থেকেছেন নির্ধারিত কোনো আলাদা স্থানে। কারও কারও জন্য আবার মাসের সময়ভিত্তিক বিন্যাসটাও নেই। লাগাতার সেবা দিয়েছেন মহামারির মহাদুঃসময়ে। কেউ কেউ পুরোটা সময় ঝুঁকি নিয়েই থেকেছেন পরিবারের সঙ্গে একই বাড়িতে, হয়তো আলাদা কক্ষে, দূরত্ব বজায় রেখে।

মা যখন বাড়ি ফেরেন, দৌড়ে আসে তাঁর সন্তান। জড়িয়ে ধরতে চায় পরম ভালোবাসায়। কিন্তু এ এমনই এক ভাইরাসের সঙ্গে লড়ে চলা, যেখানে সন্তানকে স্পর্শটুকু করার আগে মাকে হতে হবে জীবাণুমুক্ত। ১৬ বছর বয়সী ছেলে সব বোঝে, কিন্তু চার বছর বয়সী মেয়ে কি আর স্বাস্থ্যবিধি বোঝে? আমেনা সুলতানা তাই বাড়িতে ঢোকার আগেই সংকেতবার্তা দেন তাঁর পৌঁছানোর, যাতে ছোট্ট শিশুটিকে অন্য ঘরে ব্যস্ত রাখতে পারেন পরিবারের অন্য সদস্য। অপর একজন তাঁকে খুলে দেন দরজা, এরপর সরে যান। এরপর বাইরের বাথরুমে গোসল সেরে, জামাকাপড় ধুয়ে তবেই না নিজের সন্তানকে ছোঁয়ার সুখ। প্রথম দিকে শিশুটি অস্থির হয়ে যেত মায়ের গোসল সারতে দেরি হচ্ছে বলে। তবে এই নয় মাসে সে-ও হয়ে উঠেছে ‘বুঝদার’। মায়ের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই লাফিয়ে কোলে উঠতে চায় না সে আর। দূর থেকে সম্ভাষণ জানিয়ে অপেক্ষা করে থাকে মায়ের জীবাণুমুক্ত হওয়ার সময়টা। একইভাবে ‘বুঝদার’ হয়ে গিয়েছে সাদিয়া জান্নাতের তিন বছর বয়সী ছেলেটিও।

যোদ্ধারা আপনজনদের কাছে সহায়তা পেয়েছেন; তাঁর অনুপস্থিতিতে ছোট্ট সন্তানকে দেখাশোনার কাজে, কেউ হয়তো সেরে দিয়েছেন রান্নাবান্না, কেউ সামলে দিয়েছেন সংসারের অন্যান্য দায়িত্ব। সামনে থেকে লড়েছেন আমেনা, সাদিয়া, নুসরাতরা। ‘মা, তুমি আসো না কেন?’—ছোট্ট শিশুর আকুতি। একই বাড়ির অন্য কক্ষে থাকা ছোট্ট সন্তানের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে গলা ধরে এল সাদিয়া জান্নাতের। বাথরুমে থাকলেও জানেন, দরজায় মাথা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শিশুটি। তবু সবার সমর্থন পেয়েছেন ভেবে শান্তি পান তিনি, অন্য এক সহকর্মীকে যে এক বছর না পেরোনো শিশু নিয়ে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করতে চাইছিলেন সেই কর্মীর বাড়িওয়ালা! অথচ অক্লান্তভাবে রোগীর যাবতীয় কাজ করে চলেন এই সেবিকারা।

সন্তানের সমর্থন

নুসরাত সুলতানার মেয়ের বয়স ১৩ বছর। মনের টালমাটাল এই সময়টা যখন পার হচ্ছে মেয়েটি, তার মা তখন ব্যস্ত রোগ নির্ণয়ের গুরুদায়িত্ব পালনে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের আরটি-পিসিআর ল্যাবে করোনাভাইরাস নির্ণয়ের কাজ করেন এই মা। সংক্রমিত হওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম যে নমুনা, তা হাতে তুলে নিয়েই দিনরাত কাজ করছেন তিনি। তাঁর প্রতিষ্ঠানের ওই বিভাগের সব চিকিৎসকই নারী। প্রত্যেকের জীবনেই আছে নানান চ্যালেঞ্জ। সবাই মিলে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে কখনো পিছপা হননি তাঁরা। প্রথম দিকে সুরক্ষাসামগ্রীর সংকট ছিল বলে সকাল থেকে রাত বারোটা কি একটা পর্যন্ত একটানা পরে থেকেছেন সেই সুরক্ষাসামগ্রী। খাওয়াদাওয়াসহ যাবতীয় নিত্যকাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে একটানা। তাঁদের দেওয়া রিপোর্টের ভিত্তিতেই যে চিকিৎসা পাবেন রোগীরা। হয়তো অস্ত্রোপচার হবে, তার আগে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন কোভিড রিপোর্ট। হাসপাতালের আশপাশের খাবারের দোকানপাটও বন্ধ থেকেছে শুরুর দিকে, তাই খাবার জোগাড় করা বা তৈরি করার ঝক্কিও পোহাতে হয়েছে অনেক সহকর্মীকেই।

শুরুতে কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ ল্যাবরেটরির সংখ্যা কম ছিল, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাঁর বিভাগীয় প্রধান শুরু করেন তাঁদের ল্যাবরেটরিতে কোভিড-১৯ শনাক্তকরণের ব্যবস্থা। এদিকে স্কুল বন্ধ, ঘরে বন্দী, মায়ের আদরটুকু পাওয়ার সুযোগও নেই, তবু মায়ের যুদ্ধে নিজের জায়গা থেকেই সমর্থন দেয় নুসরাত সুলতানার মেয়েটি। তাই তো ল্যাবরেটরির অন্তরালে কাজ করে চলেন নিরন্তর। সতর্ক থাকতে হয় প্রতিমুহূর্তে, এ পর্যন্ত তাঁরা ল্যাবরেটরিটিকে সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছেন। কাজ বন্ধ থাকেনি একটি দিনও।

রোগীর হাসিমুখ

কোভিড-১৯ রোগী ভোগেন নানান জটিলতায়। শ্বাসকষ্ট অন্যতম—ভীষণ কষ্ট যে। অসহায়ত্ব, যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু। চোখের সামনে ঘটে যায় নিত্যদিন। জীবন বাঁচানোর লড়াই চলে প্রতিনিয়ত। চিকিৎসক হিসেবে আমি কাজ করছি জুন থেকে, স্কয়ার হাসপাতালের কোভিড আইসিইউতে। মৃত্যু ঘোষণার গুরুদায়িত্ব চিকিৎসকের। আমার মতো জুনিয়র চিকিৎসক লেখেন মৃত্যুসনদ। মৃত্যুর অক্ষরে বসানো আঙুলগুলোকে ব্যর্থ মনে হয় কখনো কখনো। কেউ আবার ভেঙে পড়েন সহকর্মীর মৃত্যুতে। সেবাদানকারী কেউ বাড়ি ফিরে নিজের বিশ্রামের সময় বাধ্য হন ঘুমের ওষুধ সেবন করতে, ভাবেন দুঃস্বপ্নের এই সময়টা এই বুঝি কেটে গেল, কেউ আবার শিশুসুলভ সময় কাটান প্রাণীদের সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত রোগীর সুস্থতাই যেন সেবাদানকারীর নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় পথ্য। মাস্কের স্তরের নিচে আটকে আসা প্রশ্বাস, সূক্ষ্ম চিন্তাশক্তি লোপ পাওয়ার উপক্রম হওয়ায় চাপে পিষ্ট মস্তিষ্ক আর স্তব্ধ হয়ে আসতে চাওয়া ভাষা, ঘোলাটে হয়ে আসা দৃষ্টি, লম্বা সময়ের জন্য ক্ষুধা-তৃষ্ণা ভুলে থাকার যুদ্ধ, আঁটসাঁট মাস্ক খোলার পর দাগ বসে যাওয়া নিজের ‘অচেনা’ মুখ—সবকিছুর চেয়ে বড় যে রোগীর হাসিমুখ।

সৌজন্যে : প্রথম আলো

বাংলাবাজার/এম এস